

কিছু কিছু শিল্পকর্ম আছে যেগুলো শুধু বিনোদন দেয় না — তারা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। বুকের ভেতর কোথাও গেঁথে যায়, আর সহজে ছাড়তে চায় না। নাওকি উরাসাওয়ার মনস্টার ঠিক তেমনই একটি কাজ। চুয়াত্তরটি পর্ব শেষ করার পর আমি শুধু চুপ করে বসে রইলাম, ফাঁকা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভার টের পেতে পেতে। যা শুরু হয়েছিল একটি ক্রাইম থ্রিলার হিসেবে, সেটি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছুতে। মানবাত্মার একটি দার্শনিক উৎখনন, যা শুধু কাল্পনিক চরিত্রদের নয়, আমাদের বাস্তব পৃথিবীকেও আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নির্মম স্বচ্ছতায়।
গল্পের শুরুটা দেখতে নিতান্তই সাদামাটা। ড. কেনজো তেনমা, জার্মানিতে কর্মরত একজন মেধাবী জাপানি নিউরোসার্জন হাসপাতালের ভেতরকার রাজনীতির শান্ত, অদৃশ্য দুর্নীতির মধ্যে দিয়ে নিজের পথ খুঁজে চলেছেন। এক রাতে তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় — ক্ষমতাধর একজন মেয়রের অপারেশন করবেন নাকি তার আগে আসা একটি নামহীন শরণার্থী ছেলেকে বাঁচাবেন? তেনমা ছেলেটিকে বেছে নেন। তাকে বাঁচান। আর সেই একটিমাত্র কাজ করতে গিয়ে তিনি অজান্তে ভবিষ্যৎ ইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষটিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেন। সেই ছেলেটির নাম ইয়োহান লিবার্ট। আর তেনমার বিবেকের সেই একটি সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তার বাকি জীবনের সুতো, যেটা একবার টানলে সব এলোমেলো হয়ে যায়।
কিন্তু যা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, তা হলো — এই দৃশ্যটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি এই মুহূর্তেও ঘটছে পৃথিবীর হাসপাতালে , বোর্ডরুমে, সংসদে, এমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যেখানে কোনো একটি মানুষের জীবনের মূল্য চুপচাপ, আমলাতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতায় তার সামাজিক মর্যাদা দিয়ে নির্ধারিত হয়। মনস্টার শুরু হয় কোনো দানব দিয়ে নয় বরং শুরু হয় একটি ব্যবস্থা দিয়ে। আর সেই ব্যবস্থাটা আমাদেরই তৈরি।
মনস্টার-এর সমস্ত চরিত্রের মধ্যে ড. হাইনেম্যান, হাসপাতালের পরিচালক, তেনমার ঊর্ধ্বতন, ইভার বাবা — আমাকে সবচেয়ে গভীরভাবে অস্বস্তিতে ফেলেন। কারণটা হলো তিনি একটুও নাটকীয় নন। তিনি নিজের হাতে কাউকে হত্যা করেন না। ইয়োহানের মতো ঠান্ডা মেধায় কাউকে মানসিকভাবে ভাঙেন না। তিনি শুধু ব্যবস্থাপনা করেন। প্রশাসন চালান। রাজনৈতিক ও সামাজিক সুবিধার নিরিখে ঠিক করেন কোন রোগী অগ্রাধিকার পাবে আর তিনি এটি করেন এমন স্বাভাবিকতা ও নিখুঁত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, যিনি বহু আগেই নিজের কাজের নৈতিক ভারটুকু অনুভব করা বন্ধ করে দিয়েছেন।
হাইনেম্যান হলেন প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের মুখ। যে ধরনের অন্যায় স্যুট পরে চলে, মাপা গলায় কথা বলে, আর ভেতরে ভেতরে নিজেকে বোঝায় যে সে আসলে যুক্তিসঙ্গত কাজই করছে। সে কোনো কমিক বইয়ের খলনায়ক নয়। সে একজন প্রশাসক। আর ঠিক এই কারণেই তাকে এত চেনা লাগে, এত অস্বস্তিকরভাবে চেনা লাগে।
আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক দুনিয়ার কথাই ভাবুন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেমন করে বিশ্বজুড়ে নেতারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। কোন জনগোষ্ঠী আগে ভ্যাকসিন পাবে, কোন এলাকায় ভেন্টিলেটর পাঠানো হবে, কার জীবন হিসাবের খাতায় একটু বেশি ভারী। ভাবুন সেই রাজনীতিবিদদের কথা, যারা একহাতে জনস্বাস্থ্য বাজেট কাটছাঁট করতে করতে অন্য হাতে মানবজীবনের পবিত্রতা নিয়ে আবেগময় বক্তৃতা দেন। ভাবুন সেই ওষুধ কোম্পানির কর্তাদের কথা, যারা জীবনদায়ী ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখেন আর একই সময়ে দাতব্য ফাউন্ডেশনের বোর্ডে বসে হাসিমুখে ছবি তোলেন। এরা সবাই হাইনেম্যানেরই উত্তরসূরি। এরা নিজেদের খলনায়ক ভাবেন না। এরা নিজেদের মনে করেন বাস্তববাদী, পরিপক্ব। দুনিয়া কীভাবে আসলে চলে সেটা বোঝেন এমন মানুষ, তেনমার মতো আদর্শবাদীদের থেকে আলাদা, যারা নাকি বোকার মতো জেদ ধরে থাকেন যে পৃথিবীটা অন্যরকম হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা হাইনেম্যানের এই ধরনের দুর্নীতিকে বলেন নৈতিক বিচ্ছিন্নতা। এই মানসিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে ভালো মানুষ মনে করা লোকেরাও ধীরে ধীরে এমন আচরণকে স্বাভাবিক করে ফেলেন, যা একসময় তাদের কাছেও অগ্রহণযোগ্য মনে হতো। হাইনেম্যান এক সকালে উঠে সিদ্ধান্ত নেননি যে গরিব রোগীরা অপ্রয়োজনীয়। তিনি সেই জায়গায় পৌঁছেছেন হাজারটা ছোট আপোষের মধ্য দিয়ে, যার প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল। একটু ছাড়, একটু অনুগ্রহ, একটি অপারেশন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য পিছিয়ে দেওয়া। আর যখন তেনমা তার মুখোমুখি হন, হাইনেম্যান বুঝতেই পারেন না যে কোথাও একটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। এটাই তার সবচেয়ে শীতল দিক। তার দুষ্টতা নয়, তার অনুভূতিহীন স্বস্তি।
আজকের রাজনীতিতে এই স্বস্তি আমরা হতাশাজনক নিয়মিততায় দেখি। যে নেতারা জানেন তাদের নীতি দুর্বল মানুষদের ক্ষতি করবে, কিন্তু শান্তভাবে হিসাব করে নেন, প্রায়ই সঠিকভাবেই, যে ওই মানুষগুলোর তাদের জবাবদিহি করার রাজনৈতিক সামর্থ্য নেই। যে নেতারা গণমঞ্চে সমতার সুমধুর কথা বলেন, আর পর্দার আড়ালে সুবিধাভোগীদের জন্য ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেন। হাইনেম্যান ১৯৯০-এর দশকের জার্মানির কোনো পুরোনো চরিত্র নন। তিনি একটি চিরন্তন ছাঁচ। তিনি সর্বত্র বিদ্যমান। তিনি সেই হাসপাতালের পরিচালক যিনি বিমাহীন রোগীকে নিচুমানের ওয়ার্ডে পাঠান। সেই মন্ত্রী যিনি মিতব্যয়িতার প্যাকেজ অনুমোদন করেন যা গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে দেবে। সেই কর্মকর্তা যিনি বিনা ঘোষণায় জরুরি আবাসন সহায়তার যোগ্যতার মানদণ্ড পরিবর্তন করেন যাতে কম মানুষ সুবিধা পায়। সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় বদ্ধ অফিসে, এমন প্রযুক্তিগত ভাষায় যা তার মানবিক মূল্য পুরোপুরি আড়াল করে রাখে। এমন মানুষদের দ্বারা যারা বাড়ি ফিরে ঠিকঠাকই রাতের খাবার খান, নিশ্চিন্তে ঘুমান।
উরাসাওয়া যা গভীরভাবে বোঝেন, আর যা মনস্টার-কে এত দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্রাসঙ্গিক করে রাখে, তা হলো এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জন্য ইয়োহান লিবার্টের মতো কোনো দানবের দরকার হয় না। শুধু দরকার হয় এমন মানুষের, যারা যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন, পরিণতি থেকে যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বে আছেন, আর নিজেদের বোঝাতে যথেষ্ট দক্ষ যে তারা যা করছেন তা-ই করতে হতো। হাইনেম্যান ভয়ংকর কারণ তিনি ব্যতিক্রম নন, কারণ তিনি সাধারণ। কারণ আজকে পৃথিবীর যেকোনো বড় প্রতিষ্ঠানে ঢুকলে কোথাও না কোথাও একটা মসৃণ টেবিলের পেছনে তাকে নিরীহ মুখে ফর্ম সই করতে দেখা যাবে।
তেনমার চরিত্রে আমাকে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে যে বিষয়টা, যে তিনি কখনো তার বিশ্বাস থেকে একচুলও সরে আসেন না যে সব জীবন সমান। এমনকি যখন ইয়োহান কী হয়ে উঠেছে তার পুরো ভয়াবহতা তার চোখের সামনে উন্মোচিত হয়, তখনও নয়। তিনি তার ক্যারিয়ার হারান, বাগদত্তাকে হারান, সামাজিক মর্যাদা হারান, স্বাধীনতা হারান, শেষমেশ নিরাপত্তাও হারান। শুধু কারণ তিনি এমন একটি ব্যবস্থায় নীরবে অংশ নিতে অস্বীকার করেছিলেন, যে ব্যবস্থা কিছু জীবনকে বাকিদের চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করে। আর গুরুত্বপূর্ণভাবে, উরাসাওয়া এটাকে বিজয়ের আলোয় উপস্থাপন করেন না। তেনমার সততার মূল্য বিশাল, এবং সিরিজটি সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সৎ।
দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মধ্যে সঠিক পথে থাকা বাস্তব সময়ে বীরত্বপূর্ণ দেখায় না। এটা দেখায় একাকিত্বের মতো। ভুল বোঝাবুঝির মতো। আইনের চোখে পলাতক হয়ে দৌড়ানোর মতো। আর যারা আসলে বিপর্যয়ের মঞ্চ তৈরি করেছে তারা ততক্ষণে শান্তিতে তাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসে পরের কর্মপরিকল্পনা আঁকছে।
তেনমার পরিস্থিতিতে একটা প্রায় অসহ্য সমকালীনতা আছে। মহামারির সময় যেসব ডাক্তার ও নার্স হাসপাতালের অনিরাপদ পরিবেশ নিয়ে সাহস করে মুখ খুলেছিলেন, তারপর উপরের প্রশাসকদের, হাইনেম্যানদের, রোষের মুখে পড়েছিলেন, তাদের কথা ভাবুন। সেই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কথা ভাবুন যারা রোগ ছড়ানো নিয়ে অপ্রিয় সত্য বলতে গিয়ে পদ হারিয়েছেন। সেই গবেষকদের কথা ভাবুন যারা ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আর দেখেছিলেন তাদের গবেষণার তহবিল নিঃশব্দে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তেনমা হলেন প্রতিটি সেই মানুষের প্রতিনিধি যিনি একদিন তার চারপাশের ব্যবস্থার দিকে স্থির চোখে তাকিয়েছেন, তার মূলগত অন্যায় চিনেছেন, আর তবু স্বস্তির বদলে বিবেককে বেছে নিয়েছেন।
আর এটাই মনস্টার-এর নৈতিক কেন্দ্র, তেনমা কখনো ভেঙে পড়েন না। কঠিন হয়ে যান না। সবকিছু চোখের সামনে দেখার পরেও ঠিক করেন না যে ইয়োহান ঠিকই বলেছিল, একমাত্র সমতা মৃত্যুতে। তার বিশ্বাস অটুটই থাকে। শেষে ইয়োহানের সামনে বন্দুক তুলেও ট্রিগার টানতে পারেন বরং যখন দ্বিতীয়বারের মতন ইয়োহানকে অপারেশন করে বাঁচিয়ে তোলেন & I think it is the most complete expression of his philosophy imaginable. He proves in the most costly way possible that he meant every word. He is not performing virtue. He is living it at tremendous personal expense in the full knowledge of what it costs him.
ইয়োহান লিবার্ট অ্যানিমেতে আমার দেখা অন্য যেকোনো ভিলেনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে গলা তোলে না। প্রচলিত অর্থে বক্তৃতা দেয় না। সে হাসে, চুপচাপ, ধৈর্যশীলভাবে, আর ভেতর থেকে মানুষকে টুকরো টুকরো করে দেয়। কারো মানসিকতার ফাটলগুলো সে খুঁজে বের করে সেখানে সূক্ষ্ম, অনুচ্চ চাপ প্রয়োগ করে, যতক্ষণ না মানুষটা নিজের ভার বহন করতে না পেরে নিজেই ভেঙে পড়ে। তার কেন্দ্রীয় দর্শন মানুষ কেবল মৃত্যুতেই সমান তার সরলতায় প্রলোভনমূলক আর তার পরিণতিতে সর্বনাশা।
কিন্তু সিরিজটা শেষ করার পর যত সময় যায়, তত বেশি করে উপলব্ধি করি যে ইয়োহানের বাগ্মিতার পদ্ধতিগুলো আমাদের সমকালীন রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে কতটা ভয়ংকরভাবে মিলে যায়। ইয়োহান প্রমাণ বা যুক্তি দিয়ে মানুষ বশ করে না। সে মানুষের গভীরতম ভয় ও অসহায়তা খুঁজে বের করে সেই ভয়গুলোকে এমনভাবে তার সামনে তুলে ধরে যেটা হঠাৎ উপলব্ধির মতো মনে হয়। সে মানুষকে অনুভব করায় যে সে তাদের সত্যিকার অর্থে দেখেছে, এত গভীরভাবে বুঝেছে যা আর কেউ পারেনি, আর তারপর সেই অনুভূতিটুকুকে নিজের লক্ষ্যে ব্যবহার করে।
এটা আধুনিক উগ্রপন্থার পাঠ্যক্রম। সেই রাজনীতিবিদ যিনি সমাধান দেন না, বৈধতা দেন। যিনি ভীত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষদের বলেন: তোমার ভয় সত্য, তোমার শত্রুরা বাস্তব, তোমাকে বিশেষভাবে, ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় করা হয়েছে, আর শুধু এই একজনই তোমার যন্ত্রণা সত্যিকার অর্থে বোঝেন। যে ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব পরম সত্য ও পরম শত্রুর ভাষায় কথা বলেন, জটিল কাঠামোগত সংকটকে স্পষ্ট খলনায়কসহ সরল নৈতিক গল্পে নামিয়ে আনেন। ইয়োহানকে কখনো গলা তুলতে হয় না। ইতিহাসের সবচেয়ে কার্যকর স্বৈরাচারীরাও তাই করেননি, অন্তত শুরুতে। তারা যা দেন তা কোলাহল নয়, অন্তরঙ্গতা। এই শীতল, ভেদকারী অন্তরঙ্গতা, যেন ফিসফিস করে বলছে: তুমি যা থেকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছ, আমি ঠিক সেটাই জানি।
ইয়োহানকে গড়েছিল ৫১১ কিন্ডারহাইম, শিশুদের মানসিকভাবে ভেঙে মানবিক অস্ত্রে পরিণত করার জন্য ডিজাইন করা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানেও বাস্তব ইতিহাসের সাথে সমান্তরালটা ইচ্ছাকৃত এবং হৃদয়বিদারক। বিংশ শতাব্দী ভরা এমন কর্মসূচিতে যা মতাদর্শিক উদ্দেশ্যে মানুষকে পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করেছে, হিটলার ইয়ুথ, স্তালিনীয় পুনর্শিক্ষা শিবির, মাওবাদী সংগ্রাম অধিবেশন। এই সব কর্মসূচি একটা কথা বুঝেছিল, যেটা মনস্টার স্পষ্টভাবে বলে। পরিচয় স্থায়ী নয়, সত্তা ভঙ্গুর, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাহীন একটি শিশুকে প্রায় যেকোনো আকারে ঢেলে সাজানো যায়। ইয়োহান সেই বোঝাপড়ার সবচেয়ে নিখুঁত পরিণতি। সে হলো তাই যা হয় যখন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা সিদ্ধান্ত নেয় যে মানুষ কাঁচামাল ছাড়া আর কিছু নয়।
সে কি যা হয়েছে তার জন্য সে নিজে সত্যিই দায়ী? এটাই সেই প্রশ্ন যার পরিষ্কার জবাব দিতে মনস্টার সুচিন্তিতভাবে অস্বীকার করে আর সে অস্বীকারটাই সঠিক। কারণ একই প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে যখন আমরা অনলাইনে র্যাডিকালাইজড তরুণদের দিকে তাকাই, যে কিশোরদের গ্যাংয়ে ভেড়ানো হয়েছে কারণ অন্য কোনো সম্প্রদায় তাদের জায়গা দিতে চায়নি, যে সৈন্যদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শত্রুকে অমানুষ দেখতে শেখানো হয়েছে। নৈতিক দায়িত্ব একটি ধারাবাহিকতায় অবস্থান করে আর সেটা সবসময় যে পরিস্থিতি তাকে গড়েছে তার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মনস্টার ইয়োহানকে ক্ষমা করে না। কিন্তু জোর দিয়ে বলে যে আমাদের তাকে বুঝতে হবে। আর এই জোরটা নিছক নিন্দার চেয়ে নৈতিকভাবে অনেক বেশি গুরুতর এবং সাহসী।
মনস্টার-এর নৈতিক মহাবিশ্বের প্রাণশক্তি হলো এই বিশ্বাস যে প্রত্যেকের মধ্যেই একটা দানব বাস করে, আর পার্শ্ব চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে এই বিশ্বাস তার সবচেয়ে গভীর প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়।
উলফগ্যাং গ্রিমার সম্ভবত সিরিজের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চরিত্র। শৈশবে এতটা গভীরভাবে মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যে নিজের আবেগের কাছে পৌঁছানোর পথটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে তার একটিমাত্র অনুভূতি বেঁচে ছিল আর তা হলো হাসি আর সেই হাসিটুকু তিনি পরে এমন পরিস্থিতিতেও পরেন যা সাধারণ মানুষকে অশ্রুতে ভেঙে দিত। ট্রেন স্টেশনে প্রতারিত হয়েও কেবল হাসেন কারণ অন্যভাবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয় সেটা তিনি আর জানেন না। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এই কারণে নয় যে তিনি নিষ্ঠুর ছিলেন, বরং কারণ তার আবেগের অনুপস্থিতিকে ভালোবাসার অনুপস্থিতি মনে হয়েছিল। তার ছেলেও একই কারণে হারিয়ে গেছে।
গ্রিমার প্রতিনিধিত্ব করেন প্রাতিষ্ঠানিক আঘাতের সেই দীর্ঘ, নিঃশব্দ পরিণতিকে। যেভাবে শৈশবে কোনো প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ক্ষতি কোনো নাটকীয় ঘোষণা ছাড়াই প্রকাশ পায়, একটা মৌলিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে, অভিজ্ঞতা আর প্রতিক্রিয়ার মাঝে এমন একটা ফাঁক হিসেবে যা প্রিয়জনদের বিভ্রান্ত করে আর শেষে দূরে ঠেলে দেয়। তিনি হলেন প্রতিটি সেই মানুষের প্রতিনিধি যিনি আজও শৈশবে কোনো ব্যবস্থার করা ক্ষতির বোঝা টেনে চলেছেন, এমন ব্যবস্থার যাকে কখনো জবাবদিহি করানো হয়নি।
তবে তার সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত যখন প্রথমবার প্রকৃত দুঃখ অনুভব করেন, যখন চোখে জল আসে তবে তাকে তেনমাকে জিজ্ঞেস করতে হয় তার মুখে ঠিক কী হচ্ছে কারণ এই অনুভূতি তিনি আগে কখনো পাননি, এটি আমার দেখা সবচেয়ে ভেঙে পড়া দৃশ্যগুলোর একটি। কারণ এটা প্রচলিত অর্থে নাটকীয় নয়, এটা এত নিখুঁতভাবে, নিষ্ঠুরভাবে মানবিক। অনুভূতিগুলো সবসময় ছিল। ধ্বংস হয়নি কখনো। শুধু মাটির অনেক গভীরে চাপা পড়েছিল। আর উরাসাওয়া বলছেন যে এটা আমাদের সবার ক্ষেত্রে সত্য। দানব আর মানুষ দুটো পৃথক সত্তা নয়, তারা সবসময় একই বুকে পাশাপাশি থাকে। কোনটি আমরা হয়ে উঠি তা নির্ধারণ করে আমাদের সাথে কী করা হয়েছে, আর আমরা সেটা দিয়ে শেষমেশ কী করি।
ইন্সপেক্টর লুঙ্গে চরিত্রলেখনের আরেকটি অসাধারণ নিদর্শন। ঠান্ডা, পদ্ধতিগত, প্রায় যন্ত্রের মতো যুক্তির পথে অবিচল, তিনি সিরিজের সেই প্রতিচ্ছবি যা দেখায় সহানুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিমত্তার কী পরিণতি হয়। তিনি ঠিক সেভাবে মেধাবী যেভাবে একটি মেশিন মেধাবী। তথ্য প্রক্রিয়া করেন, নিদর্শন চিহ্নিত করেন, নিখুঁত যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করেন। কিন্তু সেই একই কঠোরতা তাকে ভুলও করায়। যে দৃঢ়তায় তিনি তেনমাকে খুনি বলে নির্ধারণ করেন সেটা মূর্খতার ফল নয়। এটা এমন একটি মনের পণ্য, যে মন নিজের বিশ্লেষণী শ্রেষ্ঠত্বে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে বাস্তবতার বিপরীতে নিজেকে যাচাই করার প্রয়োজন অনুভব করা বন্ধ করে দিয়েছে।
আজকের সমাজে এমন লুঙ্গে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন। সেই বিশেষজ্ঞ যার মডেল অভ্যন্তরীণভাবে নিখুঁত কিন্তু যে মানবিক বাস্তবতা বর্ণনা করার কথা সেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। যে নীতিনির্ধারক যার হিসাবের খাতা অভ্যন্তরীণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগে বিধ্বংসী। লুঙ্গের পরিবর্তনের চাপ, তার ধীরে ধীরে বেদনাদায়ক উপলব্ধি যে তিনি আজীবন ভুল ছিলেন, তেনমার সামনে সমস্ত অহং গিলে আমি দুঃখিত বলার সেই মুহূর্ত, বৌদ্ধিক সততা আসলে কোন মূল্যে আসে তার একটি মাস্টারক্লাস। এর মূল্য সবকিছু। এর জন্য নিজের সম্পর্কে নিজের গড়া সম্পূর্ণ চিত্রটি ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হয়।
নিনা ফোর্টনার সিরিজের সবচেয়ে আবেগময় জটিল চাপগুলোর একটি বহন করেন। একই রক্ত, একই ভয়ংকর অতীত, তবু সে ইয়োহান হয়নি। উরাসাওয়া ইঙ্গিত দেন উত্তরটি হলো ভালোবাসা দেওয়ার এবং পাওয়ার ক্ষমতা, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। তার পরিচয় পুনরুদ্ধারের যাত্রা, দমিত স্মৃতির মুখোমুখি হওয়া আর শেষ পর্যন্ত প্রতিশোধের বদলে ক্ষমাকে বেছে নেওয়া, ইয়োহান যা প্রতিনিধিত্ব করে তার একটি শান্ত কিন্তু অসামান্য শক্তিশালী কাউন্টারপয়েন্ট।
ইভা হাইনেম্যান, প্রথম দেখায় এত সহজে তুচ্ছ মনে হয়, অগভীর ও স্বার্থপর। তাকে দেওয়া হয় একাকিত্ব, মাদকাসক্তি আর আত্মিক ধ্বংসের এক ধীর অবতরণের গল্প যা তার সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি পছন্দের চরিত্র নন এবং হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু তার ব্যর্থতায় তিনি চেনা মানবিক আর উরাসাওয়ার তাকে সহজে বাতিল না করার এই সিদ্ধান্ত সিরিজের বৃহত্তর যুক্তির সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
রবার্তো, ইয়োহানের অন্ধ অনুগত, হয়তো সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি উপস্থাপন করেন। যে সবচেয়ে বিপজ্জনক শক্তি স্বৈরাচারী নন, বরং প্রকৃত অনুগামীরা। ইয়োহান যা করেন তা রবার্তোর মতো মানুষ ছাড়া সম্ভব ছিল না, যাদের অর্থ ও অস্তিত্বের প্রয়োজন এত তীব্র যে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নৈতিক বিচার একজনের হাতে সঁপে দিতে প্রস্তুত। ইতিহাসের প্রতিটি কর্তৃত্ববাদী আন্দোলনেই আমরা এটা দেখেছি। যে অনুসারীরা সবচেয়ে ভয়ংকর অত্যাচার সম্ভব করেছে বিদ্বেষ থেকে নয় বরং এমন কারো প্রতি প্রায় ধর্মীয় নিষ্ঠা থেকে যে প্রথমবার তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে তাদের অস্তিত্বের একটা উদ্দেশ্য আছে।
ম্যাডহাউসের অ্যানিমেশন অসাধারণ এমন কৌশলে যেটা সহজে চোখ এড়িয়ে যায়, কারণ এটা এত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। রঙের প্যালেট সচেতনভাবে অনুজ্জ্বল, অন্ধকার, শীতল, উত্তর ইউরোপীয় — একটি স্থায়ী বায়ুমণ্ডলীয় ভার তৈরি করে যা শান্ত দৃশ্যগুলোকেও আতঙ্কের আবছা ছায়ায় ঢেকে রাখে। জার্মানিকে কোনো ছবির মতো পটভূমি হিসেবে নয়, বরং এমন একটা দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যার দেয়ালে ইতিহাসের ভার আছে, শীতল যুদ্ধের ছায়া এখনো তার পথঘাটে অদৃশ্যভাবে ঘুরছে — এমন একটি মহাদেশ যা ইতিমধ্যে মানবিক মতাদর্শের সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিণতি নিজের শরীরে বহন করেছে আর এখনো নিঃশব্দে তার হিসাব মেলাচ্ছে।
মুখের অভিব্যক্তিতে মনোযোগটা অতুলনীয়। মনস্টার-এর মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনার বেশিরভাগটাই যোগাযোগ হয় এমন কিছুর মাধ্যমে যা কথায় বলা হয় না — একটু বেশি সময় ধরে রাখা দৃষ্টিতে, চোখে যা মুখ বলছে তার সাথে মেলে না এমন একটা ভাব দিয়ে, এমন স্থিরতায় যেখানে নড়াচড়া থাকার কথা। সংগীত — বিষণ্ণ, অপেরাটিক, যেন ইউরোপীয় ক্লাসিক ঐতিহ্যের থেকে সরাসরি টেনে আনা — উদ্বেগ থেকে আতঙ্ক পর্যন্ত তৈরি করে, আর তারপর এমন কিছুতে মিলিয়ে যায় যা প্রায় শোকসংগীতের মতো। উদ্বোধনী ক্রম বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে: একটি অশুভ মূল সুর একটি রহস্যময় অপেরার সাথে মিলিত হয়, একটি কথা উচ্চারণের আগেই জানিয়ে দেয় যে এই গল্প সহজে তোমাকে ছাড়বে না।
এবার আসা যাক সিরিজের পেসিং-এ এবং আমাকে স্বীকার করতেই হবে তা অসম। কিছু পর্ব যেমন নিনার ফ্ল্যাশব্যাকের কিছু অংশ, দুয়েকটি একক ভিগনেট ধৈর্যের পরীক্ষা নেয় এবং সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। পাখি দেখার মানুষটির গল্প। ডিটারকে খারাপ কাজে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করা বাচ্চাদের পর্ব। এগুলো রানটাইমে তাদের জায়গা অর্জন করতে পারেনি আর বারো থেকে পনেরোটি পর্ব কেটে ছেঁটে দিলে সিরিজের কোনো অর্থপূর্ণ ক্ষতি হতো না।
কিন্তু সিরিজের সামগ্রিক সুচিন্তিত, ধীর ছন্দটি বিপরীতভাবেই হোক তাকে তার ঘরানার বাকি সব থেকে আলাদা করে তোলে। মনস্টার তার প্রতিটি উদ্ঘাটন অর্জন করে সময়ের বিনিময়ে। চুয়াত্তরটি পর্ব জুড়ে টুকরো টুকরো করে একত্রিত হওয়া ধাঁধাটি শেষে এমন একটি সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করে যা কোনো শর্টকাটে তৈরি করা সম্ভব ছিল না। Climax হওয়ার মুহূর্ত যখন আসে ততদিনে এই মানুষগুলোর সাথে এত গভীর পরিচয় হয়ে গেছে যে তাদের প্রতিটি পছন্দ প্রকৃত অস্তিত্বের ভার বহন করে।
সমাপ্তি সহজ সমাধান প্রত্যাখ্যান করে এবং সেটা সে সুচিন্তিতভাবেই করে। ইয়োহান অদৃশ্য হয়ে যায়। হাসপাতালের বিছানা খালি। তেনমা শেষ মুহূর্তে তাকে বলেছিলেন যা জানা দরকার ছিল: তার একটা নাম আছে, তার মা তাকে ভালোবাসতেন & he wasn't a accident. এটা ইয়োহানের মানবতার যা অবশিষ্ট আছে তাতে পৌঁছায় কিনা, কিছু বদলায় কিনা সিরিজটি সে উত্তর দিতে অস্বীকার করে।
এই দ্ব্যর্থবোধকতা সাহসের অভাব নয়, এটাই একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ সমাপ্তি যা এই গল্পের জন্য সম্ভব ছিল। একটি গল্প যেটি চুয়াত্তরটি পর্ব ধরে যুক্তি দিয়ে এসেছে যে মানুষ অপরিসীম জটিল, আচরণের শিকড় ইতিহাস ও পরিস্থিতির গভীরে প্রোথিত আর সত্যিকার জিজ্ঞাসার যোগ্য প্রশ্নগুলো খুব কমই পরিষ্কার উত্তর বহন করে, সেই গল্প একটি চূড়ান্ত রায় দিয়ে শেষ হলে নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত। প্রশ্ন দিয়ে শেষ হওয়াটাই সৎ। আর সেটাই হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, মনস্টার আসলে ইয়োহান লিবার্টের গল্প নয়, যতই ভয়ংকর সে হোক। তেনমার ইউরোপ জুড়ে তাড়ার গল্পও নয়, যতই আকর্ষণীয় হোক। এটা সেই প্রশ্নের গল্প যেটা সিরিজটি প্রথম পর্ব থেকেই নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করে আসছিল: একটি মানুষের জীবনের মূল্য কতটুকু আর কে সেটা নির্ধারণ করার অধিকার রাখে?
পৃথিবীর হাইনেম্যানরা প্রতিদিন এই নির্ধারণ করেন, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য দুইভাবেই যে কিছু জীবন বাকিদের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তারা এমন ব্যবস্থা নির্মাণ করেন যা এই বিশ্বাসকে কাঠামোর মধ্যে কোড করে রাখে, তারপর সেই কাঠামোকে তেনমার মতো মানুষদের প্রশ্নের সামনে থেকে সরিয়ে রাখেন। পৃথিবীর ইয়োহানরা — মতাদর্শগত শূন্যবাদীরা, বিধ্বংসে বিশ্বাসীরা, যে রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে মানবিক সমতার বিশৃঙ্খলা শ্রেণিবিন্যাসের শৃঙ্খলার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক এবং একটি অন্ধকার বিকল্প উপস্থাপন করেন: যদি সব জীবনকে ব্যবহারিকভাবে সমানভাবে মূল্য দেওয়া না যায়, তাহলে হয়তো জীবনের নিজেরই কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই। আর পৃথিবীর তেনমারা — আদর্শবাদী, ক্লান্ত, হার মানতে অনিচ্ছুক তারা জেদ ধরে থাকেন যে একটি তৃতীয় পথ আছে। যে ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এই সত্য মানে নীতিটা ভুল নয়। যে জীবনকে অসমানভাবে মূল্য দেওয়া একটি পৃথিবীতে সঠিক প্রতিক্রিয়া হলো এই সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো যে জীবন মূল্যহীন বরং যেকোনো মূল্যে সেই নীতির জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
এটা আরামদায়ক অবস্থান নয়। বিজয়ী অবস্থানও নয়। সিরিজটি অকপটে স্বীকার করে যে এর মূল্য প্রায় সবকিছু। কিন্তু উরাসাওয়া যুক্তি দেন যে এটাই একমাত্র অবস্থান যেটা সত্যিকার অর্থে মানবিক।
দানব আমাদের সবার মধ্যেই বাস করে। গ্রিমারের সেই সহিংসতায় যা পরিস্থিতি তাকে দিয়ে জাগিয়ে তোলে। তেনমার সেই অপরিবর্তনীয় আদর্শবাদিতায় যা তাকে অপরাধীদেরও বাঁচাতে প্রণোদিত করে। লুঙ্গের নিজের পরিবারের প্রতি সেই শীতল, নিষ্ঠুর উদাসীনতায়। ডাক্তারদের সেই নীরব, অভ্যাসগত সিদ্ধান্তে যারা ধনী রোগীকে ভালো চিকিৎসায় পাঠান। আমলাদের সেই ব্যবস্থায় যা দরিদ্রকে অদৃশ্য করে দেয়। রাজনীতিবিদদের সেই ভাষণে যেখানে সমতার কথা বলা হয় আর পর্দার পেছনে তার বিপরীত আইন পাশ করা হয়। যে কেউ দানব হয়ে উঠতে পারে। আমরা যে প্রতিষ্ঠান গড়ি সেগুলো এই রূপান্তরকে সহজ বা কঠিন করতে পারে। আমরা যে সম্পর্ক তৈরি করি সেগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনতে বা আরো গভীরে নিয়ে যেতে পারে। আর সিদ্ধান্তটা, সীমাবদ্ধ, অসম্পূর্ণ, কখনো আদর্শ পরিস্থিতিতে নেওয়া হয় না, শেষ পর্যন্ত আমাদেরই থাকে।
মনস্টার তোমাকে বলে না এটা দিয়ে কী করতে হবে। শুধু নিশ্চিত করে যে দেখার পর তুমি আর বলতে পারবে না, *আমি জানতাম না।*
42 out of 46 users liked this review